সৌদিআরব কি ইসরাইলের দালাল?

বিবিধ

র‌্যাডিকাল নিউজ ২৪ ডেস্ক: উম্মাহর কোথাও কিছু হলে বক্রলেজধারী বাত্বিলপন্থীরা হামলে পড়ে তাওহীদের ভূমি সৌদি আরবের উপর। এতটা বিদ্বেষ হয়তো ইয়াহুদী-নাসাদের প্রতিও রাখেনা যতটা সৌদি শাসক ও সেখানকার আলিম-উলামাদের প্রতি রাখে। আর এটাকেই তারা ঈমানী দায়িত্ব বানিয়ে নিয়েছে।

সৌদি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, তাদের হাতে আন্তর্জাতিক মানের কোন মিডিয়া না থাকা, আর শাসকদের প্রচারবিমুখী মনোভাব। যা করেন, গোপনে করে যান। এই ধরুন, সাইক্লোন সিডরে বাংলাদেশকে একশো কোটি টাকা দান করেছিল প্রাক্তন বাদশা, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তা কেউ জানত না।

ইন্ডিয়াকে কিছুদিন আগে শতকোটি টাকার অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েছে কোন প্রচারণা দেখেছেন? বাংলাদেশে প্রায় ছয় শতাধিক মসজিদ তৈরি হচ্ছে তার কোন প্রচারণা নজরে এসেছে? পাকিস্তানে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামি ইউনিভার্সিটি ও মসজিদ তৈরি হচ্ছে সামান্যতম প্রচার-প্রচারণা নজরে এসেছে? আসেনি, আসবেও না। ওরা এমনই।

শুধু বাদশা নয় সেখানকার জনগণের চরিত্রও এমন। শত শত মসজিদ, মাদরাসা বানিয়ে দেন কিন্তু কে বা কারা বানিয়েছে তার কোন হদিস পাওয়া যায়না। তারা ডান হাতে দান করেন, বাম হাতও টের পায় না। যার ফলে উম্মাহর জন্য বিশাল অংকের অর্থ সহযোগীতা এবং সহায়ক ফরেন পলিসিও চাপা পড়ে যায় শত্রুদের নানান প্রোপাগান্ডায়।

বর্তমানে মিডিয়া নামক জন্তুটা ডাইরেক্ট অথবা ইনডাইরেক্টলি প্রায় পুরোটাই ইয়াহুদী/নাসারাদের দখলে। মিডিয়ায় যা দেখানো হচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ তাই সরল মনে বিশ্বাস করছে। ফলে পর্দার অন্তরালের খবরগুলো হামেশাই চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই মিডিয়া দ্বারা কন্ট্রোল করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের মন-মগজ। যে কারণে মানুষের বিচার-বু্দ্ধি দিনকে দিন লোপ পাচ্ছে।

সত্যি বলতে বর্তমান সময়ে প্রায় ৯৯% মিডিয়াই হয়ে গেছে সৌদিআরবের সবচেয়ে বড় শত্রু ! পার্স টুডে, শিয়া আলো, শিয়া দিগন্ত, শিয়ান্তর, মিডেল ইস্ট শিয়া মনিটর, ইয়াহুদীবাদী জাজিরার মত হলুদ মিডিয়ার খবরগুলো যখন মুক্ত হস্তে আমাদের মুসলিম ভাইয়ের বিলি করে সৌদি বিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে, তখন বলার মত কোন ভাষা অথবা সুচিন্তা করার মত বিবেকবোধ আর থাকেনা।

আফসোসের পাশাপাশি বিস্মিতও হই, আমাদেরই কিছু ভাইয়ের কর্মকান্ড দেখলে। এরা এমনসব পত্রিকার রেফারেন্স এনে সৌদিকে ইসরাইলি দালাল হিসেবে প্রমান করতে চায়, যে পত্রিকাগুলো এক সময় তাদের নেতাদেরকেই ধর্ষক বানিয়েছিল। নিজেরা কখনো দেশীয় মিডিয়ার প্রতি নূন্যতম আস্থা রাখেনা যখন তা তাদের নিজের, নিজ দলের অথবা দলীয় নেতার বিরুদ্ধে যায়।

কিন্তু একই প্রোপাগান্ডা যখন আরবের বিরুদ্ধে বিশেষ করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে করা হয়, তখন নিজেদের বিদ্বেষী চশমাটা খুলে একটু যাচাই-বাচাইয়ের প্রয়োজনবোধ করেনা। অথচ এখনো যিনি সৌদি শাসক তিনি দু’দুবার সরাসরি ময়দানে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।

এবার দালালদের অবস্থান যাচাই করা যাক :

সৌদিআরব ও ইসরাইলের মধ্যে কোন সম্পর্ক রয়েছে কিনা এমন একটি প্রশ্নের জবাবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের মিশরের সিবিসি টেলিভিশন চ্যানেলের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেন, “সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে নূন্যতম কোন সম্পর্ক নেই, এবং এটা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বিরোধী।”

উৎস: http://www.arabnews.com/node/1197791

বছরের প্রথমদিকের একটি নিউজ ছিল এমন, সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান গোপনে ইসরাইল সফর করেছেন।” নিউজটা শুনে যেকেউ টাস্কি খাবেন। কেননা না আছে দূতাবাস, না আছে লেনদেন, আর না আছে কূটনৈতিক সম্পর্ক তবুও যুবরাজ সেখানে কেন যাবেন? যেখানে মুসলিম সরকারগুলো প্রকাশ্য সফর করতে গেলেও শতবার চিন্তাভাবনা করবে, সেখানে সৌদির মত একটা দেশের ভবিষ্যৎ বাদশার গোপনীয় সফর রীতিমত আতঁকে উঠার মতই।

এটা নিয়ে মিথ্যুকরা ব্যাপক প্রচারণা চালায়, কিন্তু একবারও চিন্তা করেনা যে, আজকের যুগে রাষ্ট্রনেতাদের সফরগুলো গোপন থাকেনা বরং তা এক সময়ে প্রকাশিত হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত কেউ ক্রাউন প্রিন্সের সফরের একটা ছবিও দেখাতে পারেনি কিন্তু তারপরও হরদম লিংক বিলি চলছে।

অনলাইনে ব্যাপক প্রচারণার কারণে বিষয়টি সৌদি গভর্নমেন্টের নজরে আসে এবং তারা সাথে সাথে বিবৃতি দেয়, “যুবরাজ তো দূরের কথা কোন সৌদি সরকারী কর্মকতাই ইসরাইল সফর করেনি। সৌদির জাতীয় পত্রিকা খোদ এমন মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করেছে।

উৎস: http://saudigazette.com.sa/article/520018

এর ঠিক কয়েকমাস পরেই আল কুদুসকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দখলদার ইসরাইলী সেনারা ব্যাপক ধর-পাকড়/হত্যাকান্ড চালায় মাযলুম ফিলিস্থিনিদের উপর। ফের শুরু হয় সৌদি বিরোধী প্রচারণা। অথচ ফিলিস্তিনিদের জন্য সৌদির চাইতে বেশী দরদ উম্মাহর কেউ দেখায়-নি।

সবার দরদ শুধু মুখে আর সৌদি কাজে, কুটনৈতিক তৎপরতা, অর্থ ও সাবলম্বী ফিলিস্তিন গড়ার লক্ষ্যে সবকিছু করেছে এবং আজও করছে। ওদিকে সুযোগবাজ খলীফাহ মুখোরোচক কিছু কথা বলে মিডিয়াপাড়া মাতিয়ে ফেলে। ইসরাইলকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিব, প্রয়োজনে সেনা পাঠাবো, ইসরাইল সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, নেতানিয়াহু একজন কিলার ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমরা আজও ভুলিনি রহিংঙ্গাদের জন্য ধাপ্পাবাজের জাহাজ আজও পৌঁছেনি। অন্যদিকে উল্টো ইসরাইলের সাথে বিজনেস, কুটনৈতিক সম্পর্ক, এ্যম্বাসী স্থাপন, ইসরাইল যখন পুড়ে ছাই তখন বিমান ও সেনা পাঠিয়ে আগুন নেভানো এসবের পরও কানাদের নিকটে সে-ই উম্মাহর খলীফাহ আর অন্যরা দালাল! কার্যত ফিলিস্থিনিদের জন্য কিছু করা অথবা নির্যাতন বন্ধে উদ্যোগী হওয়ার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় নি কারো মধ্যে।

মিশর আর সৌদি বাদশা দৌঁড়ঝাপ, কুটনৈতিক প্রচেষ্টা আর দেনদরবার করে এই নির্যাতন বন্ধে সচেষ্ট হন। যার কৃতজ্ঞতা স্বরুপ ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সৌদি বাদশার ব্যাপক প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

উৎস: http://saudigazette.com.sa/…/Abbas-thanks-Saudi-King

পরবর্তীতে কড়া ভাষায় সৌদির ক্রাউন প্রিন্স ও মন্ত্রী ড. আওয়াদ আল-আওয়াদ ঘোষণা করেন, “আল কুদুস হচ্ছে সৌদি বাদশা, সৌদি প্রিন্স ও সৌদি জনগনের দেহের একটি অংশ। আমাদের অবস্থান স্পট, আমরা কখনোই এটাকে ইসরাইলী রাজধানী হিসেবে মেনে নেব না বরং আমরা ফিলিস্থিনি জনগনের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে লড়াই করে যাবে।”

উৎস: http://saudigazette.com.sa/article/523874

এইতো গতবছর এপ্রিল মাসে সৌদিআরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে আরব লীগের ২৯তম সম্মেলন শেষ হয়। এই সম্মেলনকে “জেরুজালেম স্যামিট’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে সৌদি বাদশাহ সালমান বলেন, “আমরা জেরুজালেম বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে আবারও জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। পূর্ব জেরুজালেম ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এ-সময় জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ষোষণা করা হয়। তারপরেই ফিলিস্থিনিদের জন্য প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান ঘোষণা করেন।

উৎস: http://saudigazette.com.sa/…/King-Salman-donates-$150m

চোখ বন্ধ করে একবার চিন্তা করুন ১৫০ মিলিয়ন ডলার অনুদান। নিজ পকেট থেকে কখনো ১ হাজার টাকার একখানা নোট রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐ ভিক্ষুকের থালায় দিয়েছেন? আপনার মত লোকের পকেট থেকে ১০০ টাকার একটা নোট ভিক্ষুকের জন্য বেরোতেই কলিজাটা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় অথচ সেই আপনিই তাদের সমালোচনা করেন, আল্লাহর রহমতের পরেই যাদের অনুদানে আজকের এই ফিলিস্তিন টিকে রয়েছে?।

রহিঙ্গাদের জন্য কেউ দুটো গরম কথা আর বিস্কুট দিয়ে আপনার কাছে খলীফাহ হয়ে গেল, আর কেউ বাজেটের মোটা একটা অংশ ফিলিস্তিনের জন্য দিয়েও দালাল রয়ে গেল, এমন দ্বিচরণ, যুলম কি করে করতে পারেন!?

সর্বশেষ, কয়দিন ধরে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার শিকার মাযলুম ফিলিস্তিনের জন্য সৌদির দৌ্ড়ঝাপ, জরুরী ভিত্তিতে ওআইসির মিটিং, মিশরের কুটনৈতিক প্রচেষ্টার পর যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়েছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে গাজাবাসী। আম জনতা কাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখাচ্ছে, তা নাহয় আপনার পছন্দের মিডিয়া থেকেই জেনে নিন।

উৎস: https://www.arabnews.com/node/1861966/saudi-arabia

যার চোখ কানা তাকে পথ দেখানো যায় কিন্তু যার অন্তরচক্ষু আলোহীন তাকে সুপথে আনা যায়না। মহান আল্লাহ্ বলেছেন, “হে ঈমান গ্রহণকারীগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ৷ এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোন গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে৷”— [সূরাহ হুজুরাত, আয়াত: ৬]।

সুতরাং সাবধান হউন। যৌনাঙ্গ আর জিহবা অধিকাংশ মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। যৌনাঙ্গ হিফাযত করতে পারলেও জিহবা হিফাযত করা সহজ নয়। আপনাকে শেষ বিচারের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, হিসেব দিতে হবে, প্রমাণ পেশ করতে হবে, এসব যেন মাথায় থাকে। আমরা একথা বলিনা যে তারা মাসুম, আর তাদের ভুলভ্রান্তি নেই। শাসকগোষ্ঠী অনেক সময় বাধ্য হয়ে কিছু কাজ করেন, তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, আর তারা বহিরাগতদের কিরকম চাপে থাকেন তা আমি-আপনি জানিনা।

আপনি সে-সব কাজের সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু যুলম করতে পারেন না। ইমাম ফুদাইল ইবন ইয়াদ্ব (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন, “আমার যদি একটা কবুলযোগ্য দু’আ থাকত তাহলে তা শাসকের জন্য করতাম। কারণ শাসকের হিদায়াতের মধ্যে দেশ ও জনগণের কল্যাণ নিহিত আছে।” আমরাও দু’আ করি মহান আল্লাহ্ আরব শাসকদের উম্মাহ দরদী, মুখলিস বানিয়ে দিন এবং শত্রুদের শত্রুতা থেকে হিফাযত করুন — আমীন।

ইছলাহ : ইলমের সাথে, সালাফদের পথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *