পরেশপুর রহস্য

ক্যাম্পাস

র‌্যাডিকাল নিউজ ২৪ ডেস্ক: বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, সুখেনবাবু আর আমি বসে আছি তার বাড়ির বৈঠক খানায় । সুখেন বাবু নিতান্তই ভালো মানুষ । আমার চেয়ে বছর সাত আষ্টেকের এর বড় হবে । মাঝে মাঝেই যাই তার বাড়িতে । তার গল্প শোনার খুব আগ্রহ জন্মেছে ইদানিং।

দুজনেই চুপ চাপ বৃষ্টি দেখছিলাম ।আমি বললাম,তা সুখেনবাবু আজ তো বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, হবে নাকি একটা জম্পেস গল্প । উনি খানিক চিন্তা করলেন। তারপর টেবিল থেকে টপটেন সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে গালের এক পাশে চুলকে নিয়ে শুরু করলেন …

সে অনেক দিন আগের কথা, তখন আমি তাগড়া যুয়ান। বয়স আন্দাজ একুশ কি বাইশ হবে হয়তো । তখন তো শুধু টো-টো করে ঘুরে বেড়ানোই কাজ ছিল। তবে নতুন কিছু জানা বা দেখার কৌতুহলটা ছিল বেশ । তেমনি একদিন চলেগেলাম আমার মায়ের দূর সম্পর্কের এক খুরতোতো দাদার বাড়ি ।

এর আগে কখনো যাওয়া হয়নি । তাই নতুন গ্রাম, নতুন নতুন মানুষ দেখবো এটা ভেবেই আমার মনের ভেতর বেশ আনন্দ হচ্ছিলো । সেই গ্রামের নাম পরেশপুর । তো যথারীতি সেখানে পৌঁছানোর পরে এদিক সেদিক একা একাই ঘোরাঘুরি করি ভালই লাগছিল ।বেশ কিছুদিন এভাবে কেটেও গেলো । সেরকমই একদিন ঘোরাঘুরি করে ফিরছিলাম ।

তখন প্রায় দিনের আলো শেষের দিকে । হঠাৎ পরপর দুইবার গুলির আওয়াজ হলো । ওমনি সবাই চেঁচামেচি শুরু করেছিল খুন ..খুন.. খুন.. কে কোথায় আছো এখানে খুন হয়েছে হই হুল্লোড় পরে গেল পরেশপুরে।বাবলু খুন হয়েছে বাবলু খুন হয়েছে । শুনেছিলাম পরেশপুরে নাকি এরকম খুন মাঝে মধ্যেই হয় আর প্রতিটা খুনের পরে পরেশপুরে লোকজন শুধু শুধু চেঁচামেচি করে । কেউ আবার দৌড়দৌড়ি শুরু করেদিয়েছে।

আবার কারও কারও কৌতুহল হয়েছে যে, কিভাবে খুন হল ? একটু দেখে আসি। আমিও কৌতুহল বসতো একটু জোরেই হেঁটে যাচ্ছিলাম হঠাৎ পথি মধ্যে একজন বললো, আরে ভাই ওখানে গিয়ে আর কি করবেন যা হবার তা তো হয়েই গেছে । আর তাছাড়া, একটা বদমাইশ টাইপের লোক মারা গেছে এলাকা টা তাও একটু শান্তিতে থাকবে ।

ওখানে গিয়ে তো আপনি হুটোপাটি করে ঢুকতেও পারবেন না আর দেখতেও পারবেন না । তার চেয়ে বরং আমি শুরু থেকে বলছি কি হয়েছিল ।পরে না হয় পুলিশ আসলে ভীর কমলে আপনি গিয়ে দেখে আইসেন । লোকটার পরনে ছিল একটা হালকা নীল রং এর ডোরাকাটা ফতুয়া আর নেভিব্লু কালারের প্যান্ট ।

চুলে তেলদিয়ে সুন্দর ভাবে পরিপাটি করে একপাশে নুঙিয়ে সিঁথি করেছে । খোঁচা খোঁচা দাড়ি আছে তার মধ্যে একটু একটু পাক ধরেছে। আমিও তাকে জিজ্ঞাস করলাম আসলে কি হয়েছিল দাদা ?

আমাকে উনি ডেকে নিয়ে রাস্তার পাসে একাটা ব্রীজ আছে বসার জায়গাও আছে সেখানে বসার ইঙ্গিত করে উনিও বসলেন । তারপর প্যান্টের পকেট থেকে একটা চুরুটের বাক্স বের করে চুরুট ধরিয়ে বললেন, আমি হচ্ছি অমরেশ দস্তিদার, ছোটো খাটো একটা ব্যবসা করি বুঝলেন তো ।

এই এলাকায় ছোটো থেকে বড় হয়েছি কখনো কারও একটি টাকাও বেয়াইনি ভাবে নেই নি। সে যাকগে, যে লোকটা মারা গেছে তার নাম হচ্ছে বাবলু সেন । বাবলুর বাবা মা শুনেছি বাবলু ছোটো থাকতেই মারা গেছে । বাপ মা না থাকলে যা হয়, উচ্ছন্নে গেছে সেই ছোট থেকেই ।ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো আর সেই সঙ্গে পাড়ার সব মেয়েদের বিরক্ত করা, চুরি, ছিনতাই হয়ে উঠলো তার নিত্য দিনের সঙ্গী ।

এরই মধ্যে পাড়ার আরএক বখাটে অখিলের সাথে গড়ে উঠলো তার বন্ধুত্ব । এই দুইজনে মিলে পাড়ায় একটা গ্যাং তৈরি করলো। সেই গ্যাং এর কাজ ই হচ্ছে চুরি,ছিনতাই,মারামারি আর মেয়েদের বিরক্ত করা পাড়ার মানুষ অতিষ্ট ওদের কাজ কারবারে। ক্রমশই দিন যেতে লাগলো আর বাবলু অখিল বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জরিয়ে পরতে লাগলো । আস্তে আস্তে তারা স্মাগলিং,কালোবাজারী করে মাফিয়া গ্রুপ এর সাথে যোগ দিলো ।

মাফিয়া গ্রুপ আন্ডার ওয়াল্ড এ তাদের বিচরন শুরু হলো । মাফিয়া গ্রুপের একটা নীতি আছে সেখানে কোনো বেইমানের ঠাঁই নাই । যদি কোনো ক্রমে প্রমান হয় তুমি বেইমান তাহলে তৎক্ষণাত তোমাকে মরতে হবে । সব সময় সেখানে মরার জন্য এবং মারার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। আবার অনেকে জানতেও পারে না কেনো তাদের মৃত্যু হলো।

এই মাফিয়া গ্রুপের সাথে যুক্ত হওয়ার পরে তারা প্রতিনিয়ত খুন,জখম,কালোবাজারী চালিয়ে যায় ।বড়বড় ব্যবসায়ীকে টার্গেট করতো যারাই ওদের কন্ট্রোলের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করত তাদেরই সরিয়ে দিত। মানুষ মারা যেনো তাদের নিত্যদিনের সংঙ্গী হয়ে উঠলো । পুলিশ কি করবে বড় বড় রাঘব বোয়াল রা মাফিয়া দের হাতে থাকে। পুলিশ এসে তাদের অ্যারেষ্ট করলেও উপরের নির্দেশে তাদের ছেড়ে দিতে হয়।

যদিও বা কোনো পুলিশ বেশি বাড়াবাড়ি করে তবে তাকে ট্যান্সফার করা হয় দ্রুত। সেরকমই একদিন এক পুলিশ অফিসার এসেছিল বাবলু অখিলের বিরুদ্ধে শক্ত প্রমান নিয়ে । কিন্তু বাবলু অখিলের তো কিচ্ছু হলোই না মাঝখান থেকে পুলিশ অফিসারের বদলির ফ্যাক্স চলে আসলো ।

শুনেছি সেই পুলিশ অফিসারের যেখানে বদলি হয়েছিল সেখানে যাওয়ার পথে তার রোড এক্সিডেন্ট হয় । দেহ একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল লাল হয়েছিল পুরোরাস্তা । ক্রমে ক্রমে বাবলু আর অখিল আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে চারদিকে । সবাই তাদেরকে ভয় পেতো । প্রতিদিন একটা না একটা মেয়ের সর্বনাশ তারা করতো । একদিন আমার বোন কলেজ থেকে ফিরছিলো । ঐ জানোয়ার দুটোর কুনজরে পরে আর জানোয়ার গুলো হায়নার মতো ছিড়েকুড়ে খায় আমার বোনটাকে ।তারপর আমার বোনটাকে আর বাঁচাতে পারিনি ।

এই বলে অমরেশ দস্তিদার একটু থামলো ।চোখের কোণের জল মুছে চুরুটের বাক্স থেকে আর একটা চুরুট বের করে ধরিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে আবার শুরু করলেন ..বাবলু অখিল দুজনে এই খুন জখমের মাধ্যমে তাদের নিজেদের অনেক শত্রুর জন্ম দিল । ততোদিনে আরও গ্যাং তৈরি হলো । মাঝে মধ্যেই বাবলু আর অখিলের ওপর হামলা হতো । হয়তো যারা হামলা করতো তারা চাইতো বাবলু আর অখিলকে সরিয়ে দিতে পারলে ঐ আসনটা তাদের প্রাপ্য হবে ।

মাফিয়াদের জিবনের ঝুঁকি সব সময় ই থাকে বাবলু আর অখিল তা নিয়ে অতো চিন্তা করে না অবশ্য। এইতো বছর দেড়েক আগের কথা। আপনি হয়তো জানেন মাফিয়াদের গ্যাং এ কিন্তু আন্ডার কপ ঠিকি ঢুকে যায় । তেমনি একটা ছেলে ওদের গ্যাং এ ঢুকে পরে । ছেলেটার নাম ছিলো অলোক দিশারী।

ছেলেটা মোটামুটি চার পাঁচ বছর ধরে এই গ্যাং এর সাথে ছিলো । শুধু তাই নয় কোথায় কোথায় মানি লন্ডারিং হয়? ব্লাক মার্কেটে এতো অস্ত্র সস্ত্র বিক্রি হচ্ছে কার নির্দেশে ? এতো খুন এর পেছনে মদদদাতা কে ? এবং কার ইশারায় বাবলু অখিল এই কালোবাজারী স্মাগলিং করছে ? এই সব কিছুর মূল হোতা কে ? এ সবের নাকি একদম শেষ প্রান্তে পৌচ্ছে গিয়েছিল অলোক।

কিন্তু তার কিছু ইন্ফরমেশনের কারনে বড় বড় কিছু কোকেন আর অস্ত্রের চালান ধরা পরে । তারপরে অলোকের প্রতি সন্দেহ জাগে আগেই বলেছি মাফিয়া গ্যাং এ বেইমানের কোনো ক্ষমা নেই। মৃত্যু নিশ্চিত যেনে অলোক প্রানের ভয় না করে বাবলু আর অখিলের সাথে ব্যপক গোলাগুলির পরে নিহত হয় । সেই গোলাগুলিতে অখিলের পিঠে গুলি লেগেছিল ভাগ্য ক্রমে বেঁচে যায় অখিল ।

বাবলু আর অখিল এর গ্যাং কে সরিয়ে দিয়ে এরই মধ্যে তাদের জায়গা দখল করার স্বপ্ন দেখছিল আর এক শক্তিশালী গ্যাং শিপলু গ্যাং । শিপলু ও একজন দূর্ধর্ষ ব্যাক্তি ছিল । শিপলু ও এই লাইনেই ছোট থেকে বড় হয়েছে ।শিপলু আবার তার বন্ধুর স্ত্রীকে জোর করে তুলে নিয়ে এসে তার রক্ষিতা করে রেখেছিল। শিপলু যাকে রক্ষিতা করে রেখেছে তার নাম মালতি রানী ।

মালতি রানীর সাথে শিপলুর এক ছোটো বেলার বন্ধুর বিয়ে হয়। আর শিপলু সেই বিয়েতে যাওয়ার পরে মালতি রানীকে ভালো লেগে যায় । এর পরেই শুরু হয় মালতিকে নিজের করে নেওয়ার চক্রান্ত । হঠাৎ একদিন রাতে শিপলু মালতির স্বামীকে নৃশংস ভাবে খুন করে মালতি রানীকে তুলে নিয়ে আসে।

চোখের সামনে স্বামীকে মরতে দেখে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন মালতি রানী। তারপর থেকে মালতি কে শিপলুর রক্ষিতা হয়ে দিন কাটাতে হয়। সে যাই হোক, তো শিপলু মনে মনে বাবলু আর অখিলকে সরিয়ে দিয়ে তাদের জায়গা দখল করতে চায় এবং একক রাজত্ব সৃষ্টি করতে চায় ।

বাবলু আর অখিল ছোটো বেলা থেকে স্কুলে যায়নি,লেখাপড়া করেনি তাতে কি হয়েছে দুজনেই ছিল খুব ধূর্ত । কৌশলে তারাও তাদের পথের কাঁটা গুলো সরিয়ে দেওয়ার প্লান করছিল । সেই লিস্টে শিপলুর নাম ও ছিল । আচমকা একদিন শিপলুর গ্যাং এর বেশ কিছু ছেলেকে মেরে ফেলে বাবলু আর অখিল ।

যার ফলে শিপলুও মাথা গরম করে বেরিয়ে পরে বাবলুও অখিল গ্যাং আক্রমণ করতে ।অখিল ও বাবলু তো প্রস্তুত ই ছিল । ঐ দিকে আবার শিপলু তার গ্যাং এর বেশ কিছু ছেলে হারিয়ে কমজোড় হয়ে যায় এবং গোলাগুলিতে বাবলুর হাতে শিপলুর প্রান যায় । তারপর থেকে অবশ্য মালতি রানীকে বাবলু নিয়ে যায় মনরন্জনের খোরাক মেটানোর জন্য। মালতিকে বাবলু বাইজি বানিয়ে রেখেছে । মালতিও খুশি কারণ তার স্বামীর হত্যাকারীকে বাবলু মেরেছে ।

এই ভাবেই কাটছিল দিন হঠাৎ করে একদিন অখিল কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না । গোটা এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও অখিলকে খুজে পাওয়া গেলনা । এদিকে বাবলুও চিন্তায় পড়ে গেলো । অখিল কাউকে কিছু না বলে এভাবে তো নিরুদ্দেশ হয়না কখনো । গ্যাং এর ছেলে পেলে সহ বাবলু খোঁজাখুজি শুরু করে দিল। দিন তিন চারেক পরে অখিলের লাশ পাওয়া গেল পরেশপুর গ্রামের এক ব্রীজের নিচে ।

তখন ব্রীজের নিচে জল ছিলো না শুকিয়ে কাদামাটি হয়েছিল। লাশের গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই । লাশের পাশে একটা ডায়াজিপামের শিশি আর একটা চুরুটের খালি বাক্স পাওয়া যায় । যার ওপরে ইতালিয়ান হরপে ‘A’ লেখা । প্রাথমিক অবস্থায় পুলিশ এসে লাশ পোষ্টমর্টামের জন্য পাঠিয়ে দিল আর স্পটে ডায়াজিপামের শিশি ও চুরুটের বাক্স ছাড়া আর কিছু পায়নি ।

পোষ্টমর্টামের রিপোর্টে ও পাওয়া গেলো ডায়াজিপামের অতিরিক্ত মাত্রার কারনে অখিলের মৃত্যু হয়েছে । পুলিশ বাবলু আর অখিল গ্যাং এর জন্য পরেশপুর কন্ট্রোল করতে পারে না । উপর মহল থেকে চাপ আসে । তাই চুপ থেকে সব সহ্য করতে হয় ।

আর এই অখিলের লাশ যখন পাওয়া গেলো তখন পুলিশ ও এমন ভাবে একটা রিপোর্ট তৈরি করলো যে, অখিল অতিরিক্ত মাত্রায় ডায়াজিপাম নিয়েছিল । যার ফলে বাড়িতে আসার সময় ব্রীজের কাছে এসে চুরুট ধোরানোর জন্য বসেছিল আর হয়তো কোনো একসময় ব্রীজের ওপর থেকে নিচে পরে যায় এবং তার মৃত্যু হয় ।

তবে বাবলু কিন্তু পুলিশের রিপোর্ট বিশ্বাস করেনি। আর এদিকে অখিলের মৃত্যুর পর বাবলু একা গ্যাং নিয়ে দূর্বল হয়ে পরে। বাবলু খুব সতর্ক ভাবে থাকে কিন্তু সে বুঝতে পারছিলো না আসলে অখিলের খুন টা কে করল? আর বুঝবেই বা কিভাবে তারা তো আর শত্রুর কমতি রাখেনি।

অখিলের মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তো তারা কয়েকটা গ্যাং কে শেষ করে দিয়েছে তাদের মধ্যে শিপলু গ্যাং ছিল অন্যতম যাকে শেষ করতে তাদের অনেক কৌশলের প্রয়োজন হয়েছিল। তাহলে নতুন কোনো গ্যাং কি অখিল কে মেরে দিলো ? আসলে কে অখিল কে খুন করলো ? কিছুই বুঝে উঠতে পারে না বাবলু । বাবলু কয়েক দিন চুপচাপ থাকে ।

পরেশপুরে তখন শান্তি বিরাজ করছিল । মোটামুটি অনেক দিনই কেটে গেলো। এইতো কিছু দিন আগে বাবলু দুজনকে বিনা দোষে রাস্তায় গুলি করে মেরে ফেললো হয়তো আবার বাবলু তার আগের রুপে ফিরে আসতে চেয়েছিল ।বাবলু হয়তো বুঝেছিলো যে অখিল যেহেতু খুন হয়েছে হয়তো তারও সময় এসে গেছে ।

সেই জন্যই বেশ অনেক দিন ই চুপচাপ ছিল এবং সচেতন থাকার কারনে বেঁচে ছিল । কিন্তু অনেক দিন কেটে যাওয়ায় তার মন থেকে সেই ভয় বা আতঙ্ক চলে যায় এবং আবার পুরাতন রুপে ফিরে আসার চেষ্টা করে । আর এখানেই বাবলু ভুলটা করে বসে । অনেক দিন পর মালতি রানীর নাচ দেখে বাবলু বেরিয়েছে ।

তখন হয়তো বলা হয়নি মালতি রানী ছোটো বেলা থেকে ভালো নাচ করে আর বাবলু শিপলু কে মারার পরে এটা জানতে পেরেই মালতি রানীকে বাইজি করে রেখেছিল । সে যাকগে , মালতি রানীর ওখান থেকে বেরিয়েছে। একাই ছিল,আর মালতি রানীর কাছে সে একাই যাওয়া আসা করতো। তার গ্যাং এর ছেলেদের রাখতো না মালতির কাছে আসার সময় ।

আর এটাই মোক্ষম সময় ছিল বাবলু কে খুন করার। সেই সুযোগ টাই লুফে নিয়েছে খুনি । খুনি অবশ্য অনেকক্ষণ তক্কে তক্কে ছিল। বাবলু বেরিয়ে রাস্তায় রাখা গাড়ির দিকে যাচ্ছে । গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, বাবলু রাস্তায় ওঠার সাথে সাথে পরপর দুটো গুলি করে চুপ করে সরে এলো খুনি । অখিল কে তো আগেই মেরেছে, আর এখন বাবলু কে মারলো ।

এই বলে অমরেশ দস্তিদার হাত দিয়ে ইসারায় যেখানে বাবলুর মৃত দেহ পরে আছে ঐদিকে দেখিয়ে বললেন, এবার যান ওখানে দেখে আসুন জানোয়ার টাকে।

তারপর সুখেন বাবু বললেন,আমি উঠে যাচ্ছি ওমনি পেছন থেকে উনি ডেকে বললেন ও-মসাই আপনি তো বাড়িতে আবার এদিক দিয়েই ফিরবেন তাই না ? আমি মাথা নেড়ে জানালাম হুম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে গেলাম লাশের কাছে । এখন অবশ্য খুব একটা লোক জনের ভীর ও নেই । কয়েকটা পুলিশের লোক আর আশেপাশের লোকজন আছে । গিয়ে দেখি লোকজন বলাবলি করছে এখন যদি পরেশপুরে পুরোপুরি ভাবে শান্তি আসে ।

অখিলের লাশ পাওয়ার পরে একটু শান্তি এসেছিল এখন পুরোপুরি শান্তি আসবে পরেশপুরে । তাদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম আমি এতক্ষণ যেই ব্রীজের ওপরে বসে অমরেশ দস্তিদারের কথা শুনছিলাম ঐ ব্রীজের নিচেই নাকি অখিলের লাশ পাওয়া গিয়েছিল কি সাংঘাতিক! একটু কাছে গিয়ে দেখি বাবলুর লাশটার ওপরে একটা সাদা কাপড় দেয়া আছে, অবশ্য তারপরেও বোঝা যাচ্ছে গুলি দুটো বুকে লেগেছিল ।

কারণ সাদা কাপড় বুকের ওখান থেকে লাল হয়েছিল। পুলিশ লাশ নিয়ে পোষ্টমর্টামের জন্য পাঠিয়ে দিল এবং ওখানে পুলিশের যা যা করনীয় থাকে তা সম্পন্ন করতে লাগলো । আমি আর ওখানে বেশিক্ষণ না দাড়িয়ে ফিরছিলাম । ফেরার পথে ঐ ব্রীজের কাছে এসে দেখলাম অমরেশ দস্তিদার চলে গেছে। কিন্তু তার চুরুটের বাক্সটা ওখানেই পরে আছে । হয়তো ভূল করে রেখে গেছে।

বাক্সটার কাছে গিয়ে বসলাম তারপরে বাক্সটা হাতে নিয়ে খুলে দেখি তার মধ্যে একটা চিরকুট। যাতে ছোট ছোট অক্ষরে স্পষ্ট করে লেখা, ওরা অনেক নিরিহ মানুষ কে মেরেছে । অনেক মেয়ের সর্বনাশ করেছে যাদের আর পরে বাঁচানো যায়নি। হয়তো তাদেরই মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য জানোয়ার দুটোকে কেউ মেরেছে! তা জানোয়ারটার লাশ দেখে আপনার কি মনে হয়, ওদের উচিত শিক্ষা হয়েছে তো? পরেশপুরে এখন শান্তির সুবাস বইবে। ভালো থাকবেন আর আমাকে এতোটা সময় দেবার জন্য ধন্যবাদ ।

তারপর আসতে করে চুরুটের বাক্সটা বন্ধ করি এবং আমি আশ্চর্য হই একটা জিনিস দেখে । সে কি আমি এটা আগে কেন খেয়াল করিনি ? মূহূর্তেই আমার রক্তের সীরায় তড়িৎ খেলে গেলো । হাত পা কাঁপতে শুরু করলো । দ্রুত হার্ড বীট বেড়ে গেলো। অমরেশ দস্তিদারের কথায় এতোটাই মহিত হয়ে ছিলাম যে চোখের সামনের চুরুটের বাক্সটা ভালো করে খেয়ালই করিনি।

যার ওপরে ইতালিয়ান হরপে লেখা ‘A’ …তৎক্ষনাত আমি চুরুটের বাক্সটা ব্রীজের নিচে জলে ফেলে দিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করি এবং পরদিন খুব ভোরে বাড়ি ফিরে আসি । পরে অবশ্য জেনেছি পুলিশ বাবলুর মার্ডারটা গ্যাং ওয়ার বলে কেসটা ক্লোজ করেছিল ।

এই বলে সুখেন বাবু টেবিলে রাখা টপটেন সিগারেটের প্যাকেট টা হাতে নিলেন । কিন্তু তাতে একটা সিগারেট ও আর অবশিষ্ট নেই। কখন যে তার এক প্যাকেট সিগারেট শেষ হয়ে গেছে কখন যে বাইরের বৃষ্টি থেমে গেছে আমরা দুজনের একজন ও টেরই পাইনি….

লেখক
চঞ্চল কুমার
সরকারি তিতুমীর কলেজ ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *